হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দেশটিকে বিভক্ত করা এবং এর রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আট মাস পর এর পরিণতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর হিসাব-নিকাশের চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার ফলে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বিশ্ববাণিজ্যের ওপর চাপ এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক তেহরান সফরকে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করা উচিত।
শত্রুর অলীক ধারণা এবং ইরানের প্রতিরোধে বিশ্ববাসীর বিস্ময়
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতারা ভুলভাবে মনে করেছিলেন, সামরিক চাপ প্রয়োগ করে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করা যাবে। অথচ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করেছে, সামরিক সরঞ্জামে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই দ্রুত রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করা যায় না।
বরং ইরানি জনগণের প্রতিরোধ ও সহনশীলতা এবং দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ঐক্য ও সংহতি এই সংঘাতকে ইরানের শত্রুদের জন্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক-উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে পরিণত করেছে।
বর্তমানে বিশ্বের বহু সুপরিচিত বিশ্লেষক হরমুজ প্রণালীকে কেবল একটি কৌশলগত জলপথ হিসেবে নয়, বরং বিশ্ব জ্বালানিবাজারকে প্রভাবিত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচনা করছেন। এখন পর্যন্ত ইরান নিজের স্বার্থ এবং ইসলামী প্রতিরোধ অক্ষের বৃহত্তর স্বার্থ এগিয়ে নিতে এই কৌশলগত সুবিধা যথেষ্ট কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন
অন্যদিকে, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর নেতারা জানেন, তেল পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে, যা বিশেষত আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি জটিল রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
এ কারণেই বারাক ওবামা তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে হরমুজ প্রণালীকে ইরানের জন্য একধরনের ‘ভেটো ক্ষমতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক একটি জনমত জরিপের ফলাফলের সঙ্গে ওবামার এই বক্তব্যকে মিলিয়ে দেখা উচিত। ওই জরিপে বলা হয়েছিল, ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেন। এসব বিষয়ই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়কে স্পষ্ট করে তোলে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে
পশ্চিমা বিষয়ক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক হামিদ লাশকারির মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে সামরিক চাপ প্রয়োগ করলেই আক্রমণকারীদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয় না।
বারাক ওবামার সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিভল্যান্ডে ডেমোক্র্যাটদের একটি নির্বাচনী সমাবেশে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন।
লাশকারির ব্যাখ্যায়, হরমুজ প্রণালীকে ইরানের ‘ভেটো ক্ষমতা’ হিসেবে উল্লেখ করার অর্থ হলো-পুরো বিশ্বও যদি কোনো একটি সিদ্ধান্তে একমত হয়, কিন্তু ইরান তাতে সম্মতি না দেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। অর্থাৎ, ইরানের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করে বিজয় ঘোষণা করতে পারবে না।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ইরানের প্রকৃত শক্তি ও ইরানি জনগণের সক্ষমতার এটি একটি দিক, যা যুদ্ধের আগে ‘আত্মসমর্পণপন্থীরা’ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করতেন। তাঁরা সন্দেহ সৃষ্টি করতেন যে ইরান দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে পারবে না; আর যদি তা করেও, তাহলে পুরো বিশ্ব ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে।
জাতীয় দৃঢ়তার ছায়ায় ইরানিদের আত্মবিশ্বাস
লাশকারি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, যার ফলে ব্যাপক জনবিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে দেশটির আত্মবিশ্বাসের যে প্রকাশ ঘটেছে, এসব ঘটনা তার প্রভাবের একটি অংশ মাত্র। এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জনগোষ্ঠীর শক্তিমত্তার আরও বিস্তৃত দিক রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হবে।
ইমাম সাদিক (আ.) গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক পরিষদের সদস্য ড. মেহদি ইসলামীও এ প্রসঙ্গে বলেন, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার স্পন্দিত হৃদয় এবং ইরানের জন্য একটি অনন্য ভূরাজনৈতিক সুবিধা। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব দিন দিন আরও বাড়ছে।
তিনি বলেন, এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা এবং এ অঞ্চলে ও এর আশপাশে ইরানের উপস্থিতি নিয়ে শত্রুপক্ষের তীব্র উদ্বেগ-এসবই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আঞ্চলিক শক্তি ও উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতার সুস্পষ্ট প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, ইরানের বক্তব্য যুক্তিসংগত ও প্রমাণভিত্তিক। এ অঞ্চলে ইরানের শক্তিশালী উপস্থিতির উদ্দেশ্য হলো, নৌচলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিভিন্ন জাতির অধিকার রক্ষা করা। এই বিষয়টিকে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার কিংবা বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম হতে দেওয়া উচিত নয়।
ইরানের সদিচ্ছা ও দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বর্তমান শক্তিশালী অবস্থান বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা, সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি এবং শত্রুপক্ষের বহুমাত্রিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ফল।
যে জাতি আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং জাতীয় ও বিপ্লবী বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে, সে জাতি স্বাধীনতার মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকে। এমন একটি জাতি বিদেশি শক্তিগুলোর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার বিপরীতেও নিজের এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
তিনি বলেন, অন্যদিকে আমাদের কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে এই কৌশলগত প্রণালীর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত্তম সম্পদ হলো জনগণের সক্ষমতা এবং প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার সংস্কৃতি।
নিঃসন্দেহে, টেকসই নিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সমাজের সাধারণ মানুষের সচেতনতা স্বাধীনতাকামী বৃহত্তর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং জাতীয় অর্থনীতি বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামাজনিত মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে।
বক্তব্যের শেষে ড. ইসলামী বলেন, দীর্ঘ আট মাস ধরে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকার বিষয়টি প্রমাণ করেছে যে পশ্চিমাপন্থীরা ইরানের শক্তির প্রকৃত মাত্রা বুঝতে পারেননি। এখনো তাঁরা বিভিন্ন ছাড় দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চাইছেন। কার্যত, তাঁরা এমন একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও অদম্য জনগোষ্ঠীকে আত্মসমর্পণের পথে চালিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
অথচ তাঁদের বুঝতে হবে, এই ক্ষেত্রে ইরানের বর্তমান শক্তিশালী অবস্থান অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি জাতীয় ও বিপ্লবী দৃঢ়তার ফসল।
প্রতিবেদক: সাইয়্যেদ মুহাম্মদ মাহদি মুসাভি
আপনার কমেন্ট